জাতিসংঘে পালিত হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’: বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য ও বিনম্র শ্রদ্ধায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালিত হয়েছে। ঐতিহাসিক এই দিনটি স্মরণে নিউইয়র্কে মিশনের মিলনায়তনে এক বিশেষ স্মারক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের স্থায়ী প্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের শীর্ষ কূটনীতিক, জাতিসংঘ সচিবালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উক্ত অনুষ্ঠানে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তাঁদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্মরণে আলোচনা করা হয়।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন,
“গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে বাংলাদেশের আপামর জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ ছিল এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গণআন্দোলন একটি শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাতির দৃঢ় অঙ্গীকার ও একতার প্রতীক।”
রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার এজেন্ডা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি সরকারের ‘থ্রি-আর’ (3R) কৌশল—রিকভারি (Recovery), রেস্টোরেশন (Restoration) এবং রিকনস্ট্রাকশন (Reconstruction)—এর বিশদ ব্যাখ্যা দেন।
তিনি উল্লেখ করেন, এই তিন স্তরের কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো:
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার (Recovery): ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা।
প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনঃপ্রতিষ্ঠা (Restoration): গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন কার্যকারিতা ও সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।
টেকসই পুনর্গঠন (Reconstruction): দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করা।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সবসময় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও মূলনীতির প্রতি অবিচল। বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে অনুকরণীয় ভূমিকা পালন করে যাবে।
স্মারক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত একটি বিশেষ তথ্যচিত্র (Documentary) প্রদর্শনী। এতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ত্যাগ, অদম্য প্রতিরোধ এবং কীভাবে এই বিপ্লব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে—তা বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হয়।
উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিক ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা বিপ্লব-উত্তর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, প্রশাসনিক সংস্কার এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং নতুন বাংলাদেশকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সমাপনী বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত নোমান চৌধুরী বিশ্ব দরবারে বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশকে তুলে ধরতে প্রবাসীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।