জামালপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে র্যাগিং; ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজ শহর, জেলা বা ভিটেমাটির টান ছেড়ে এলাকার বাহিরে প্রথমবার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ক্যাম্পাসে পা রাখা নবাগত শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে এসেছে এক পৈশাচিক ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের খড়গ। ২৪ এর আন্দোলনের পর থেকে সকল ছাত্রছাত্রীদের প্রাণের দাবি ছিল কোনো ক্যাম্পাস বা প্রতিষ্ঠানে যেন র্যাগিং এর মতো সংস্কৃতি কখনো ফিরে না আসে। কিন্তু জামালপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের চতুর্থ ব্যাচের (ইমিডিয়েট সিনিয়র) শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পঞ্চম ব্যাচের (নবাগত) শিক্ষার্থীদের ওপর সুপরিকল্পিত ও নৃশংস র্যাগিংয়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। শুধু হাতে গোনা কয়েকজন নয়, বরং চতুর্থ ব্যাচের সবাই এই পৈশাচিক নির্যাতনে সরাসরি যুক্ত ছিল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ঘটনার ভয়াবহতা এতই বেশি যে, হল ও ডাইনিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজে পুরো ঘটনার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিচার পাওয়ার আশা পাচ্ছেন না নবাগতরা।
ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী ময়মনসিংহ পোস্টকে জানান, ঘটনার সময় হলের ডাইনিং রুম ও সংশ্লিষ্ট এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাধীন ছিল। সেই ফুটেজে চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পৈশাচিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের হকিস্টিক ও লাঠি নিয়ে প্রবেশের দৃশ্য স্পষ্ট থাকার কথা। কিন্তু ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা নবাগত হওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে এই ফুটেজ চাওয়ার মতো মানসিক সাহস বা পরিস্থিতি তাদের নেই। তাদের অভিযোগ, সিনিয়রদের অব্যাহত হুমকি ও প্রভাবের কারণে তারা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায়, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি পঞ্চম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগাযোগের সুবিধার্থে একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ খোলে। সেখানে অত্যন্ত কৌশলে চতুর্থ ব্যাচের কিছু সিনিয়র সদস্য যুক্ত হয়ে পরবর্তীতে সাধারণ কথোপোকথনের কিছু অংশ স্ক্রিনশট আকারে সংরক্ষণ করে তাদের ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে ফেলা হয়। ওরিয়েন্টেশনের নামে তাদের হলে ডেকে এনে ডাইনিং রুমে অবরুদ্ধ করে হকিস্টিক ও লাঠিসোটা দিয়ে রাতভর পিটানো হয়।
নির্যাতনের একপর্যায়ে পুরো ঘটনার কোনো ছবি বা ভিডিও প্রমাণ যেন বাইরে না যেতে পারে, সেজন্য চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা জোরপূর্বক উপস্থিত নবাগতদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। এরপর ফোনে ধারণকৃত বা সংরক্ষিত সমস্ত ছবি ও ভিডিও ফাইল চিরতরে ডিলিট করে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, “জন্মের পর থেকে পরিবারের বাইরে কখনো একা থাকি নি। কিন্তু সেদিন রাতে যা সহ্য করতে হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সিনিয়ররা একসঙ্গে আমাকে ঘিরে ধরে মুখে সিগারেট গুজে ধোঁয়া ছড়াতে থাকে এবং টেবিলের নিচে মাথা দিয়ে বসিয়ে রেখে রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত একটানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়।”
ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, এই বর্বরতায় ৪র্থ ব্যাচের সবাই জরিত ছিল কিন্তু তাঁরা সবাইকে চিহ্নিত করতে পারেনি, যাদের চিহ্নিত করতে পেরেছে তারা হলো — মোহাম্মদ নিশান, মৃদুল হাসান, নাইম হাসান, মো. আল ইমরান হোসাইন এবং ইয়াসির ফারহাত।
তাদের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মগুলোর মধ্যে ছিল:
১। ব্যক্তিগত জীবন ও চলাফেরা সম্পূর্ণ সিনিয়রদের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করা।
২। চুল একদম ছোট রাখতে বাধ্য করা এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্টসহ ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৩। ক্যাম্পাসের যেকোনো কুকুরকেও দেখলে সালাম দেওয়া।
৪। অতিরিক্ত গরমের মধ্যেও ফুল হাতা শার্ট পরা এবং গলার সব বোতাম আটকে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করা।
৫। ক্যাম্পাসের কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ না করা এবং খেলাধুলা থেকে বিরত থাকা (তবে সিনিয়ররা খেললে মাঠে বাধ্যতামূলক দর্শক হিসেবে বসে থাকতে হবে)।
৬। নিজেদের ব্যাচমেট মেয়েদের ‘ভাবী’ বলে সম্বোধন করতে বাধ্য করা।
ভুক্তভোগীরা জানান, অভিযুক্তরা এখন আবার তাদের রুমে রুমে গিয়ে ‘ইনট্রু’ দিতে বাধ্য করছে, যেখানে আরও বড় নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে। পরিবারকে জানালে বাবা-মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন—এই ভয়ে তারা বিষয়টি এতদিন চেপে রাখতে বাধ্য হন।
দেশের একটি সরকারি প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরনের জঘন্য র্যাগিং, জোরপূর্বক মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া এবং সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও নবাগতদের এমন অবমাননাকর পরিস্থিতির শিকার হওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
কলেজ প্রশাসন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবিলম্বে ফুটেজ সংগ্রহ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও নেটিজেনরা।