দেশে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। টানা তিন মাস ধরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিবিএসের তথ্য বলছে, এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা আরও বেড়েছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ, আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ, শুধু খাদ্য নয়, বাসস্থান, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতেও ব্যয় বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবী, দিনমজুর, শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। আয় বাড়ার তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মাসিক বাজেটে খাদ্য ব্যয়ের অংশ বাড়তে থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সঞ্চয়সহ অন্যান্য খাতে ব্যয় সংকুচিত করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক পরিবার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির নিচে অবস্থান করছে। ফলে বাস্তব অর্থে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
খাদ্যপণ্যের দামই মূল চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ, মাংস ও ডিমসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উঁচু পর্যায়ে ধরে রেখেছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের উচ্চ মূল্যও বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। এসব কারণে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
গ্রামে চাপ আরও বেশি
বিবিএসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতির হার বেশি। মে মাসে গ্রামে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যেখানে শহরে এ হার ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। এতে কৃষিশ্রমিক, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা, আমদানি ব্যয় কমানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার মতো সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগ ব্যয় কমবে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
যদিও ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতির হার ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবু মাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাজারে প্রতিটি অতিরিক্ত টাকার চাপ এখন দৈনন্দিন জীবনের বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।