কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে এবার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ছয় মাস পর মসজিদের ১৩টি দানসিন্দুক খুলে গণনা শেষে পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা, যা মসজিদের ইতিহাসে একবারে সর্বোচ্চ দানের রেকর্ড।
শনিবার (২৮ জুন) সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে টানা প্রায় সাড়ে ১৩ ঘণ্টা গণনার পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে এই হিসাব নিশ্চিত করেন পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, এবার ১০টি লোহার দানসিন্দুক ও ৩টি টিনের ট্রাঙ্ক খোলা হয়। নগদ অর্থের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালঙ্কার, রৌপ্য এবং মূল্যবান অলংকার পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের পৃথক তালিকা প্রস্তুত করে পরবর্তীতে মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
সকালেই কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান-এর উপস্থিতিতে দানসিন্দুকগুলো খোলা হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় শুরু হয় টাকা গণনার কাজ।
গণনার জন্য প্রায় ৬০০ জনের একটি দল দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ জন মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকরা অংশ নেন। সিন্দুক থেকে বের করা অর্থ ৪৩টি বড় বস্তায় ভরে গণনার স্থানে নেওয়া হয়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, সাধারণত তিন থেকে চার মাস পরপর দানসিন্দুক খোলা হলেও এবার বিপুল পরিমাণ অর্থ জমে যাওয়ায় প্রায় ছয় মাস পর সেগুলো খোলা হয়েছে।
লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠিত পাগলা মসজিদে আন্তরিক নিয়তে মানত করলে তা পূরণ হয়। এ বিশ্বাস থেকে শুধু মুসলমান নয়, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষও এখানে দান করেন। দেশ-বিদেশের অনেক ভক্ত অনলাইন ব্যাংকিং ও ডিজিটাল মাধ্যমে অনুদান পাঠানোর পাশাপাশি গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, সোনা-রূপা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীও দান করে থাকেন।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে আসা অঞ্জনা রাণী দাস জানান, তার একটি মানত পূরণ হওয়ায় তিনি দান করতে এসেছেন। অন্যদিকে নরসিংদী থেকে আসা প্রবাসী জামিল উদ্দিন প্রবাসে থাকা অবস্থায় করা মানত পূরণ করতে একটি ছাগল নিয়ে মসজিদে হাজির হন।
সর্বশেষ গণনার অর্থ ব্যাংকে জমা হওয়ার পর পাগলা মসজিদের বিভিন্ন হিসাবের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৩০ কোটি ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
জেলা প্রশাসক ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের দানের অর্থ কেবল মসজিদের উন্নয়নেই নয়, জেলার বিভিন্ন এতিমখানা, মাদ্রাসা, দরিদ্র রোগীর চিকিৎসা, অসহায় মানুষের সহায়তা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।
তিনি আরও জানান, দানের অর্থের একটি অংশ দিয়ে প্রায় ১১৫ থেকে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ‘পাগলা মসজিদ ইসলামিক কমপ্লেক্স’ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়িত হলে সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৬০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। প্রকল্পটিতে থাকবে আধুনিক ইসলামিক গবেষণা কেন্দ্র, লাইব্রেরি, অতিথিশালা, পার্কিং সুবিধা ও উন্নত অজুখানাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।
উল্লেখ্য, এর আগে পাগলা মসজিদের দানসিন্দুক খুলে সর্বোচ্চ ৯ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি পাওয়া গিয়েছিল। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে প্রায় ১৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা পাওয়ায় দেশের অন্যতম দানসমৃদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাগলা মসজিদ আবারও আলোচনায় এসেছে।