মুগদা মেডিকেলে রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর হামলা, কর্মবিরতিতে ইন্টার্ন-ট্রেইনিরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মুমেক) এক ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাত দেড়টার দিকে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের ইউনিট-২-এ এ ঘটনা ঘটে। এতে দুই চিকিৎসক ও এক ওয়ার্ডবয় আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত ওয়ার্ডবয়কে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে হামলাকারীদের বিচার এবং চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেছেন হাসপাতালের ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকরা। তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় দুইজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করে মুগদা থানায় মামলা করা হয়েছে। হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মো. মোস্তফা কামাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় মো. রুহান ও আসিফ নামে দুজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বড় হালিয়া এলাকায় এবং বর্তমানে তারা যাত্রাবাড়ীর সুতি খাল এলাকায় বসবাস করেন বলে জানা গেছে।
ক্যান্সার রোগীর মৃত্যু
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট সাইফুল ইসলাম (৫০) নামের এক রোগী ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিন তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে আইসিইউতে শয্যা খালি না থাকায় তাকে সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।
চিকিৎসকদের দাবি, রোগীর স্বজনদের বিষয়টি জানানো হয় এবং অন্য কোনো হাসপাতালে রোগীকে নেওয়ার জন্য কাউন্সেলিং করা হয়। একই সঙ্গে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় হাসপাতালে অবস্থান করলে যেকোনো সময় রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে বলেও জানানো হয়েছিল।
শুক্রবার রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাইফুল ইসলামের মৃত্যু হয়। এরপরই তার স্বজনদের একটি দল কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কক্ষে হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলায় আহত চিকিৎসক ও ওয়ার্ডবয়
হামলার সময় ডা. আল আমিন শাওন, ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. নুজহাত তাবাসসুম সিন্থিয়া এবং ট্রেইনি চিকিৎসক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন আক্রান্ত হন। চিকিৎসকদের রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে ওয়ার্ডবয় জাহাঙ্গীরও হামলার শিকার হন।
ডা. আল আমিন শাওনের ভাষ্য, রোগীর মৃত্যুর পরপরই একদল লোক চিৎকার করতে করতে চিকিৎসকদের কক্ষের দিকে এগিয়ে আসে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। বাইরে থাকা ট্রেইনি চিকিৎসক ও ওয়ার্ডবয়কে ফেলে মারধর করা হয়। হামলাকারীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকারও চেষ্টা করে।
তিনি জানান, সহকর্মীদের বার্তা পাঠানোর পর প্রায় ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে অন্যান্য চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে এসে তাদের উদ্ধার করেন।
ডা. শাওন বলেন, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতির অভিযোগ থাকলে তার আইনগতভাবে তদন্ত ও বিচার হতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে চিকিৎসকের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়।
চিকিৎসকের ফেসবুক পোস্ট
ঘটনার পর ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. নুজহাত জাহান সিন্থিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার সময়ের ছবি প্রকাশ করে ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, হামলার সময় তিনি নাইট ডিউটিতে ছিলেন এবং হামলায় তিনি নিজেও আহত হয়েছেন। তার দাবি, ট্রেইনি চিকিৎসকও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলেন।
রোগীর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, রোগীর ফুসফুসের ক্যান্সার আগে থেকেই শনাক্ত হয়েছিল। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকরা স্বজনদের রোগীর অবস্থা এবং আইসিইউ প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জানান। আইসিইউতে শয্যা না থাকায় অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি
ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. আদনান হামজা জানান, হামলায় জড়িতদের শাস্তি এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন। পাশাপাশি ওয়ার্ডে আনসার সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে হামলার বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. মেজবাহুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে রোগীর স্বজনদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।