শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ
নেত্রকোণায় জুয়ার আসরঃ যুবদল নেতা, ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবি সদস্যসহ আটক ৮ ২ দিন আগে ময়মনসিংহে নানা আয়োজনে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উদযাপন: হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব নিয়ে সেমিনার ৪ দিন আগে নেত্রকোণার মদনে ওএমএসের ৫ হাজার কেজি চাল পাচারের চেষ্টা: বিএনপি নেতাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা ৬ দিন আগে তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই গ্রিসের সঙ্গে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি ইসরায়েলের ১ সপ্তাহ আগে বাকৃবিতে হলের সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা, কঠোর পর্যালোচনা করছে প্রশাসন ১ সপ্তাহ আগে ডিসি গোল্ডকাপ ফুটবল: ফুলবাড়িয়া ও গফরগাঁওকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ঈশ্বরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ সদর ১ সপ্তাহ আগে নেত্রকোনার পূর্বধলায় ছাত্রশিবিরের ‘A+ সংবর্ধনা–২০২৬’ অনুষ্ঠিত ২ সপ্তাহ আগে মাদারগঞ্জে সেচ পাম্পের ঘর থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার ২ সপ্তাহ আগে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশকে নেওয়ার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করল পাকিস্তান ২ সপ্তাহ আগে নেত্রকোনায় রাতের আঁধারে ডেপুটি স্পিকারের উদ্যোগে লাগানো গাছের চারা ধ্বংস ২ সপ্তাহ আগে

শিক্ষার্থীদের নীরব সংকট: ঘুমের অভাবে হারাচ্ছে শেখার ক্ষমতা

বর্তমান যুগে একাডেমিক সাফল্য অর্জনের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। ভালো ফলাফল, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং ভবিষ্যতে একটি সফল কর্মজীবন গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা অধিক সময় পড়াশোনায় ব্যয় করছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রচেষ্টার মাঝে অবহেলিত থেকে যায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করলেই ভালো ফলাফল নিশ্চিত হয় না; বরং শেখার দক্ষতা, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, পর্যাপ্ত ঘুম মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পাশাপাশি মস্তিষ্কও পুনরুজ্জীবিত হয় এবং সারাদিনে অর্জিত তথ্যগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করে। ঘুমের ঘাটতি মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।

ঘুম ও শিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টনে অবস্থিত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘হেলদি স্লিপ’ প্রকল্পের গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম শেখার প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ। গবেষকদের মতে, দিনের বেলায় শেখা তথ্য ঘুমের সময় মস্তিষ্কে প্রক্রিয়াজাত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়। ফলে পর্যাপ্ত ঘুম পাওয়া শিক্ষার্থীরা নতুন বিষয় দ্রুত শিখতে এবং তা দীর্ঘদিন মনে রাখতে বেশি সক্ষম হয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়াশোনা করার প্রবণতা এখনও ব্যাপকভাবে দেখা যায়। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, ঘুমের সময় কমিয়ে পড়ার সময় বাড়ালে ভালো ফলাফল করা সম্ভব। কিন্তু গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় অবস্থিত সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি মনোযোগ কমিয়ে দেয়, শেখার ক্ষমতা হ্রাস করে এবং একাডেমিক পারফরম্যান্সকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এমনকি ঘুমের অভাবে জানা বিষয়ও পরীক্ষার সময় মনে করতে সমস্যা হতে পারে।

ঘুমবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম ড. ম্যাথিউ ওয়াকার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের সেন্টার ফর হিউম্যান স্লিপ সায়েন্সের পরিচালক এবং বিশ্বব্যাপী সমাদৃত গ্রন্থ Why We Sleep–এর লেখক। ২০১৭ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ঘুম মস্তিষ্কের শেখার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে সহায়তা করে। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্ক নতুন তথ্য গ্রহণের সক্ষমতার একটি বড় অংশ হারিয়ে ফেলে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের ২০১৫ সালের সুপারিশ অনুযায়ী, ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, অনলাইন বিনোদন এবং একাডেমিক চাপের কারণে অনেক শিক্ষার্থী এই প্রয়োজনীয় ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঘুমের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব নিয়ে আরও শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব টিউবিঙ্গেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লিউবেকের গবেষক বিয়র্ন রাসচ ও ইয়ান বর্নের ২০১৩ সালে প্রকাশিত গবেষণায়। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Physiological Reviews-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়, ঘুমের সময় ‘মেমোরি কনসোলিডেশন’ নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন শেখা তথ্য দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়। গবেষকদের মতে, এ কারণেই পর্যাপ্ত ঘুম শিক্ষার্থীদের শেখার দক্ষতা ও পরীক্ষার ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বর্তমানে স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস শিক্ষার্থীদের ঘুমের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণা অনুযায়ী, মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট এবং কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (Blue Light) ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে ঘুমাতে দেরি হয় এবং ঘুমের মানও কমে যায়। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দেন।

ঘুমের অভাব শুধু পড়াশোনার ওপর নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। CDC-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ক্লান্তি, বিরক্তি, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

শিক্ষাবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্যের জন্য পড়াশোনা এবং বিশ্রামের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। নিয়মিত অধ্যয়ন, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রযুক্তির সচেতন ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সাফল্যের জন্য শুধু কঠোর পরিশ্রম নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্রামও। তাই রাত জেগে পড়াশোনাকে সাফল্যের একমাত্র পথ হিসেবে না দেখে শিক্ষার্থীদের উচিত নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা। কারণ একটি সতেজ ও সুস্থ মস্তিষ্কই একজন শিক্ষার্থীকে তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিতে পারে।

Desk News

এই প্রতিবেদকের লেখা নিয়মিত পড়ুন বাংলা নিউজ প্রোতে।

২৭ টি প্রকাশিত লেখা