স্ট্রোকের পর কথা বলতে সমস্যা? জেনে নিন অ্যাফেসিয়া সম্পর্কে
লাকী আক্তার সুমা
স্ট্রোকের পর অনেক রোগীকেই দেখা যায়, তিনি পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারছেন, আশপাশের সবকিছু বুঝতে পারছেন, কিন্তু নিজের মনের কথা ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারছেন না। কেউ প্রয়োজনীয় শব্দ খুঁজে পান না, কেউ অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধায় পড়েন, আবার কারও পড়া বা লেখার দক্ষতাও কমে যায়।
অনেকেই এই অবস্থাকে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, বার্ধক্যের স্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা মানসিক রোগ বলে ভুল করেন। অথচ এটি একটি নির্দিষ্ট স্নায়ুবিক ভাষাগত সমস্যা, যার নাম অ্যাফেসিয়া (Aphasia)।
অ্যাফেসিয়াঃ অ্যাফেসিয়া হলো এমন একটি স্নায়ুবিক অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্কের ভাষা-নিয়ন্ত্রণকারী অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে একজন ব্যক্তির কথা বলা, অন্যের কথা বোঝা, পড়া কিংবা লেখার ক্ষমতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়।
আমেরিকান স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ-হিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (ASHA)-এর তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশ মস্তিষ্কের বাম হেমিস্ফিয়ারে অবস্থান করে। এই অংশে ক্ষতি হলে অ্যাফেসিয়া দেখা দিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যাফেসিয়া কোনো মানসিক রোগ নয় এবং এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমিয়ে দেয় না। অর্থাৎ রোগী সবকিছু বুঝতে পারেন, কিন্তু ভাষার মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশে সমস্যা-অসুবিধায় পড়েন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোক বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ। আর স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতার মধ্যে অ্যাফেসিয়া অন্যতম।
অ্যাফেসিয়ার কারণঃ-
অ্যাফেসিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো স্ট্রোক। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে (Ischemic Stroke) অথবা রক্তনালী ফেটে রক্তক্ষরণ হলে (Hemorrhagic Stroke) ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে—
–মাথায় গুরুতর আঘাত (Traumatic Brain Injury)
–মস্তিষ্কে টিউমার
–মস্তিষ্কের সংক্রমণ (যেমন এনসেফালাইটিস)
–নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ (যেমন Primary Progressive Aphasia)
–অন্যান্য স্নায়ুবিক রোগ
অ্যাফেসিয়ার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত তিনটি হলো—
১. ব্রোকাস অ্যাফেসিয়া (Broca’s Aphasia) একে Expressive Aphasia-ও বলা হয়।
এই ধরনের রোগীরা অন্যের কথা তুলনামূলকভাবে ভালো বুঝতে পারেন, কিন্তু নিজের কথা বলতে গেলে প্রয়োজনীয় শব্দ খুঁজে পান না। ফলে তারা ছোট, ভাঙা বা অসম্পূর্ণ বাক্যে কথা বলেন।
২. ওয়ার্নিকেস অ্যাফেসিয়া (Wernicke’s Aphasia) একে Receptive Aphasia বলা হয়।
এ ক্ষেত্রে রোগী সাবলীলভাবে কথা বললেও কথাগুলো অনেক সময় অর্থহীন বা প্রসঙ্গবিচ্যুত হয়। একই সঙ্গে অন্যের কথা বুঝতেও তার সমস্যা হয়।
৩. গ্লোবাল অ্যাফেসিয়া (Global Aphasia) এটি সবচেয়ে গুরুতর ধরন। এতে কথা বলা, অন্যের কথা বোঝা, পড়া এবং লেখা—সব ধরনের ভাষাগত দক্ষতাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাধারণ লক্ষণঃ-
অ্যাফেসিয়ার লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত দেখা যায়—
–কথা বলতে গিয়ে প্রয়োজনীয় শব্দ খুঁজে না পাওয়া।
–ছোট বা অসম্পূর্ণ বাক্যে কথা বলা।
–পরিচিত মানুষ বা বস্তুর নাম মনে করতে অসুবিধা।
–অন্যের কথা বা নির্দেশনা বুঝতে সমস্যা।
–পড়া ও লেখার দক্ষতা কমে যাওয়া।
–কথোপকথনের সময় বারবার থেমে যাওয়া বা ভুল শব্দ ব্যবহার করা।
আরেকটি বিষয় অনেকসময় মিলিয়ে ফেলেন। অ্যাফেসিয়া ও ডিসআর্থ্রিয়া এক নয়।
অনেকেই অ্যাফেসিয়া ও ডিসআর্থ্রিয়াকে একই সমস্যা মনে করেন।
অ্যাফেসিয়া হলো ভাষা প্রক্রিয়াকরণের সমস্যা, যেখানে কথা বলা, বোঝা, পড়া বা লেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে ডিসআর্থ্রিয়া (Dysarthria) হলো মুখ, জিহ্বা বা ঠোঁটের পেশির দুর্বলতার কারণে কথা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ রোগী কী বলতে চান তা জানেন, কিন্তু স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে পারেন না।
চিকিৎসায় স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপির ভূমিকা
স্ট্রোকের পর রোগীর জীবন রক্ষায় দ্রুত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা পুনরুদ্ধারে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি পুনর্বাসনের অন্যতম প্রধান অংশ।
ভাষাগত মূল্যায়নঃ প্রথমে একজন নিবন্ধিত স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট রোগীর ভাষাগত সক্ষমতা মূল্যায়ন করেন এবং সমস্যার ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক থেরাপি পরিকল্পনা তৈরি করেন।
ভাষার বিকাশঃ নিয়মিত থেরাপির মাধ্যমে শব্দ খুঁজে বের করা, বাক্য গঠন, কথোপকথন, পড়া এবং লেখার দক্ষতা ধীরে ধীরে উন্নত করার চেষ্টা করা হয়।
যেসব রোগীর ভাষাগত সমস্যা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে ছবি, ফ্ল্যাশকার্ড, অঙ্গভঙ্গি কিংবা ডিজিটাল যোগাযোগ ডিভাইসের মতো বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা (AAC) ব্যবহার শেখানো হয়, যাতে তারা দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো প্রকাশ করতে পারেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোকের পর যত দ্রুত স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি শুরু করা যায়, তত ভালো ভাষাগত পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে।
পরিবারের সদস্যদের ভূমিকাঃ-
অ্যাফেসিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থতায় পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
–ব্যক্তিকে কথা শেষ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া।
–ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে এবং ছোট বাক্যে কথা বলা।
–একসাথে অনেক প্রশ্ন না করে একটি করে প্রশ্ন করা।
–প্রয়োজনে ছবি, লেখা বা অঙ্গভঙ্গির সাহায্য নেয়া যায়।
–সামান্য উন্নতিতেও রোগীকে উৎসাহ দেয়া।
–রোগীকে পারিবারিক ও সামাজিক আলোচনায় অংশ নিতে উৎসাহিত করতে হবে।
–ব্যক্তির হয়ে সব সময় উত্তর দিয়ে দেওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত।
স্ট্রোকের পর শুধু হাত-পায়ের শক্তি ফিরে পাওয়াই পূর্ণাঙ্গ সুস্থতার লক্ষণ নয়। একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য তার *ভাষা ও যোগাযোগের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই স্ট্রোকের পর কথা বলা, অন্যের কথা বোঝা, পড়া বা লেখায় যেকোনো পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত নিউরোলজিস্ট এবং স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা, নিয়মিত থেরাপি এবং পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতাই একজন মানুষকে আবার স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।
লেখকঃ
শিক্ষার্থী, স্পিচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি বিভাগ, ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি এন্ড হেলথ সায়েন্সেস
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আমেরিকান স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ-হিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (ASHA), আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশন (ASA),