জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করা এবং একই ঘটনায় তিনজনের প্রাণহানির অভিযোগে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হবে আগামী রোববার (২৮ জুন)।
পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, সব ধরনের শুনানি ও যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ায় মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই মামলার অপর আসামিরা হলেন খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান, সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকার। এদের মধ্যে চঞ্চল চন্দ্র সরকার কারাগারে থাকলেও অন্য চারজন বর্তমানে পলাতক।
যে ঘটনার বিচার
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় চলমান আন্দোলনের সময় আমির হোসেন নামে এক তরুণ প্রাণ বাঁচাতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশ ধরে ঝুলে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
একই ঘটনায় পুলিশের গুলিতে সাত বছরের শিশু বাসিত খান মুসা, তার দাদি মায়া ইসলাম এবং নাদিম নামে আরেক ব্যক্তি নিহত হন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
তদন্ত থেকে বিচার
মামলার তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরু করেন। বিচার চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। উপস্থাপন করা হয় ভিডিও ফুটেজ, আলোকচিত্র, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল আলামত।
এক পর্যায়ে নতুন ডিজিটাল প্রমাণ উপস্থাপনের আবেদন করায় রায় ঘোষণার নির্ধারিত তারিখ পিছিয়ে যায়। পরে প্রথম সাক্ষী আমির হোসেনকে পুনরায় জেরা ও অতিরিক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের দ্বিতীয় দফার যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল ২৮ জুন রায়ের দিন নির্ধারণ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের অবস্থান
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাপ্য।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তারা পাঁচ আসামির খালাস প্রার্থনা করেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ রায়ের অপেক্ষা
পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এটি অন্যতম আলোচিত মামলা। আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রোববার ঘোষিত হতে যাওয়া এই রায় শুধু আলোচিত রামপুরা গুলিকাণ্ডের বিচারই নয়, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন জানিয়েছে, রায় ঘোষণার কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।