শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ
নেত্রকোণায় জুয়ার আসরঃ যুবদল নেতা, ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবি সদস্যসহ আটক ৮ ২ দিন আগে ময়মনসিংহে নানা আয়োজনে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উদযাপন: হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব নিয়ে সেমিনার ৪ দিন আগে নেত্রকোণার মদনে ওএমএসের ৫ হাজার কেজি চাল পাচারের চেষ্টা: বিএনপি নেতাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা ৬ দিন আগে তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই গ্রিসের সঙ্গে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি ইসরায়েলের ১ সপ্তাহ আগে বাকৃবিতে হলের সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা, কঠোর পর্যালোচনা করছে প্রশাসন ১ সপ্তাহ আগে ডিসি গোল্ডকাপ ফুটবল: ফুলবাড়িয়া ও গফরগাঁওকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ঈশ্বরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ সদর ১ সপ্তাহ আগে নেত্রকোনার পূর্বধলায় ছাত্রশিবিরের ‘A+ সংবর্ধনা–২০২৬’ অনুষ্ঠিত ২ সপ্তাহ আগে মাদারগঞ্জে সেচ পাম্পের ঘর থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার ২ সপ্তাহ আগে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশকে নেওয়ার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করল পাকিস্তান ২ সপ্তাহ আগে নেত্রকোনায় রাতের আঁধারে ডেপুটি স্পিকারের উদ্যোগে লাগানো গাছের চারা ধ্বংস ২ সপ্তাহ আগে

বিশ্বমঞ্চে প্রাতিষ্ঠানিক সততার বিপর্যয়: বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার

বিশ্বমঞ্চে প্রাতিষ্ঠানিক সততার বিপর্যয়: বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাডেমিক সেক্টরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নামকরা জার্নাল থেকে বাংলাদেশি লেখকদের অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (Retraction) করা হয়েছে বলে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (Peer-review), তথ্যের অসংগতি, প্লেজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তি এবং পেপার মিলের মাধ্যমে লেখকস্বত্ব বেচাকেনার মতো গুরুতর অভিযোগে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে স্প্রিঞ্জার নেচার, এলসেভিয়ার, উইলি, হিন্দাউই ও আইইইই-এর মতো বৈশ্বিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো।

আন্তর্জাতিক গবেষণা নজরদারি সংস্থা ‘রিট্রাকশন ওয়াচ’ এবং অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে প্রাপ্ত ৩২৫টি প্রত্যাহৃত গবেষণার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম এসেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (৪৪টি)। এরপরই রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (৪২টি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (৩২টি), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় (২১টি) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০টি)। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি করে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের ১০টি করে গবেষণা এই তালিকায় রয়েছে।

গবেষণাপত্রগুলোর প্রত্যাহার বিজ্ঞপ্তিতে বৈশ্বিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো প্রধানত চার ধরণের অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে। প্রথমত, পিয়ার রিভিউ বা বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কারচুপি করে ভুয়া মূল্যায়ন যুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, বাস্তব পরীক্ষার পরিবর্তে কাল্পনিক উপাত্ত ব্যবহার এবং তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি। তৃতীয়ত, অন্যের লেখা চুরি করা এবং অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে কৃত্রিমভাবে সাইটেশন বাড়ানো। চতুর্থত, অর্থের বিনিময়ে পেপার মিলের মাধ্যমে লেখকস্বত্ব কেনাবেচা এবং বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিং বাড়াতে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে চুক্তিভিত্তিক মানহীন গবেষণা প্রকাশ করা।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইসিই বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খানের ২৬টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। দেড় বছরের ব্যবধানে তিনি ও তাঁর দল অন্তত ৮০টি গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন, যা প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের বদলে কেবল ‘সতর্কবার্তা’তেই সীমাবদ্ধ ছিল। এছাড়া বিআইডিএসের গবেষণা ফেলো মুনতাসির মোরশেদের ৮টি গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে, যিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেছিলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ১০টি গবেষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, সুন্দরবনের প্লাস্টিক দূষণ ও কোভিড-১৯ সংক্রান্ত গবেষণায় বাস্তব পরীক্ষার বদলে কাল্পনিক উপাত্ত এবং পুরোনো তথ্যের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের সাবেক প্রভাষক মমিনুর রহমানের ৭টি এবং বিজিসি ট্রাস্টে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও ড্যাফোডিলের নাম ব্যবহারকারী গবেষক তালহা বিন ইমরানের ১০টি গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির নাম ব্যবহারকারী আব্দুল কাদের মহিউদ্দিনের ৯টি এবং ইউআইইউ-এর অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামানের ১১টি গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগে বাতিল করেছে প্রকাশনা সংস্থাগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছেন, একেকটি গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনা আন্তর্জাতিক ফুটবল মাঠে একেকটি লাল কার্ডের মতো। এই প্রবণতা বাংলাদেশি গবেষকদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি আশঙ্কাজনকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জালিয়াতির প্রমাণ মিললেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা প্রধানত শিথিল। উদাহরণস্বরূপ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু রেজা মো. তৌফিকুল ইসলামের ৯টি গবেষণা প্রত্যাহার হওয়া সত্ত্বেও নীতিমালার অভাব দেখিয়ে তাঁকে কেবল ‘লঘুদণ্ড’ বা সতর্ক করেই দায় সেরেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও, যেখানে প্রত্যাহৃত গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই পদোন্নতি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

গবেষণায় জালিয়াতি বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানিয়েছেন, কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া প্রথমত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। তবে বিশ্ববিদ্যালয় যদি অভিযোগ উপেক্ষা করে বা ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে ইউজিসি নিজে তদন্ত করবে এবং সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

একাডেমিক সততা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম পুনরুদ্ধারে এখন ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের সুধীসমাজ।

Md Mumin

এই প্রতিবেদকের লেখা নিয়মিত পড়ুন বাংলা নিউজ প্রোতে।

৪৫ টি প্রকাশিত লেখা