তীব্র গরমের মধ্যেই ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে নাজেহাল হয়ে পড়েছে ময়মনসিংহবাসী। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় জেলার শহর ও গ্রামজুড়ে চলছে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গ্রাহকদের ভাষায়, “এখন আর বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসে।”
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে বি আর পাওয়ার জেন এবং আরপিসিএল-এর দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে ময়মনসিংহ অঞ্চলে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে বলেও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ময়মনসিংহে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪৯ মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৬ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৩ মেগাওয়াট ঘাটতি নিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পালাক্রমে লোডশেডিং করা হচ্ছে।
শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, ময়মনসিংহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও দিনে ও রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক এলাকায় কয়েক মিনিট পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিপণিবিতান, ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সময়মতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন ও বিক্রিতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান জেনারেটর বা আইপিএস ব্যবহার করলেও বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে সামনে এইচএসসি, আলিম ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বেড়েছে। রাতের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই।
স্বাস্থ্যসেবাও এই সংকটের বাইরে নয়। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও অধিকাংশ বড় হাসপাতাল বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে, তবুও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট সেবাদানে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, “জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ না বাড়লে লোডশেডিং কমানোও সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
তবে পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ময়মনসিংহবাসীকে আরও কিছুদিন বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি সহ্য করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।