দেশে সরকারি ও বেসরকারি সেবাখাতে দুর্নীতি ও ঘুষের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, সেবা গ্রহণে দুর্নীতির শিকার হওয়ার দিক থেকে দেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। অন্যদিকে, সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে খুলনা বিভাগ।
রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে। জরিপটি দেশের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতের ওপর পরিচালিত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয়ভাবে ৮১.৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৬৩.৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা প্রয়োজনীয় সেবা পেতে গিয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। টিআইবির ভাষ্য, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও ঘুষ—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক চিত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ময়মনসিংহ
জরিপে দেখা যায়, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৮.৯ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই বিভাগে ৬৬.৬ শতাংশ মানুষ ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে খুলনা বিভাগে ৭৩.৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষের শিকার হয়েছেন, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ; সেখানে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৮৮ শতাংশ মানুষ।
অন্যান্য বিভাগের চিত্রও উদ্বেগজনক। বরিশালে দুর্নীতির শিকার ৮৭.৬ শতাংশ ও ঘুষের শিকার ৬৯.১ শতাংশ, রংপুরে যথাক্রমে ৮৫.৭ ও ৬২.৮ শতাংশ, ঢাকায় ৮০.১ ও ৬৩.৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৭৯.৪ ও ৫৯.৪ শতাংশ, সিলেটে ৭৯.৩ ও ৫৮.৯ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ৭২.৯ ও ৫৮.৮ শতাংশ সেবাগ্রহীতা দুর্নীতি ও ঘুষের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
বছরে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি
টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সেবাখাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৫.৯ শতাংশ বেশি। এই অর্থ দেশের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের প্রায় ১.৫৮ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.২৩ শতাংশের সমান।
“ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না”
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনেক সেবাগ্রহীতা জানিয়েছেন, “ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না।” তাঁর ভাষায়, এটি ঘুষের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের একটি স্পষ্ট লক্ষণ। তিনি বলেন, দুর্নীতির কারণে দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে দালালনির্ভরতা ও ঘুষের সংস্কৃতি কমেনি। কার্যকর জবাবদিহি, শাস্তির নিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট (আইএসআরটি)-এর সাবেক অধ্যাপক সেকেন্দার হায়াত খান, পিকে মো. মতিউর রহমান, মোহাম্মদ শোয়ায়েব, অধ্যাপক সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সেবাখাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, জবাবদিহি বাড়ানো এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।