বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ দিনে ফুটবলপ্রেমীরা উপহার পেলেন এক অবিশ্বাস্য নাটকীয় ম্যাচ। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘জে’ গ্রুপের শেষ লড়াইয়ে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া ৩-৩ গোলে ড্র করে দু’দলই নিশ্চিত করেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ জায়গা। তবে এই ড্রয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে ইরান। অতিরিক্ত সময়ের শেষ সেকেন্ডে অস্ট্রিয়ার সমতাসূচক গোলেই ভেঙে যায় এশিয়ার দেশটির প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নকআউটে ওঠার স্বপ্ন।
ম্যাচ শুরুর আগেই সমীকরণ ছিল অত্যন্ত জটিল। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনা আগেই নকআউট নিশ্চিত করেছিল। অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার সমান পয়েন্ট থাকলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে ছিল অস্ট্রিয়া। অন্যদিকে ‘জি’ গ্রুপে নিজেদের সব ম্যাচ শেষ করে তিন পয়েন্ট নিয়ে অপেক্ষায় ছিল ইরান। আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচে যে কোনো একটি দল জিতলেই সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটে জায়গা পেত ইরান। কিন্তু ড্র হলে এগিয়ে যেত আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া—শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটেছে।
ছয় গোলের মহারণ
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল। ম্যাচের ২৮তম মিনিটে অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড মার্কো আরনাউটোভিচের গোলে এগিয়ে যায় অস্ট্রিয়া। তবে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বেলগালি গোল করে আলজেরিয়াকে সমতায় ফেরান।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫তম মিনিটে মার্সেল সাবিৎসারের গোলে আবারও এগিয়ে যায় অস্ট্রিয়া। কিন্তু মাত্র পাঁচ মিনিট পরই অধিনায়ক রিয়াদ মাহরেজ গোল করে স্কোরলাইন ২-২ করেন। এরপর দুই দলই কিছুটা সতর্ক হয়ে খেললেও নাটক জমে ওঠে যোগ করা সময়ে।
ইরানের আনন্দ, তারপরই হতাশা
যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে (৯০+৩) রিয়াদ মাহরেজ নিজের দ্বিতীয় গোল করে আলজেরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। সেই মুহূর্তে সমীকরণ বদলে যায়। অস্ট্রিয়া বিদায়ের পথে, আর নকআউটে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ইরান।
কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগে, ৯০+৬ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামা ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার স্ট্রাইকার সাশা কালাইজিচ দুর্দান্ত হেডে গোল করে অস্ট্রিয়াকে ৩-৩ সমতায় ফেরান। সেই এক গোলেই বদলে যায় পুরো চিত্র। অস্ট্রিয়া রানার্সআপ হিসেবে এবং আলজেরিয়া সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউটে উঠে যায়। আর ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে যায় হৃদয়ভাঙা হতাশায়।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আবহ
এই ম্যাচকে ঘিরে বিশেষ আগ্রহের আরেকটি কারণ ছিল ১৯৮২ সালের কুখ্যাত “ডিসগ্রেস অব গিহোন”। সে বছর আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়ার ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত ফলাফলের কারণে বিশ্বকাপের শেষ গ্রুপ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজনের নিয়ম চালু করে ফিফা। ৪৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয় দুই দল, আর এবারও তাদের ম্যাচ ঘিরে তৈরি হয় নাটকীয় সমীকরণ—যদিও এবার শেষ পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে ছয় গোলের রোমাঞ্চই জয়ী হয়।
ইরানের জন্য নির্মম সমাপ্তি
ইরান নিজেদের গ্রুপে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও মিশরের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচই ড্র করে অপরাজিত থেকেও বিদায় নেয়। মিশরের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে যোগ করা সময়ের জয়সূচক গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়েছিল। এরপর তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচের ওপর।
কয়েক মিনিটের জন্য মনে হয়েছিল ভাগ্য তাদের পক্ষেই যাচ্ছে। কিন্তু কালাইজিচের শেষ মুহূর্তের গোল সেই স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার নকআউটে ওঠার সুযোগ আবারও হাতছাড়া হয় ইরানের। এছাড়া পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই দলটি ভিসা, ভ্রমণ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিজনিত নানা জটিলতার মুখোমুখি হয়েছিল, যা নিয়েও কোচ ও খেলোয়াড়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
শেষ ৩২-এর সূচি
গ্রুপ ‘জে’ থেকে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সঙ্গে নকআউটে উঠেছে রানার্সআপ অস্ট্রিয়া এবং সেরা তৃতীয় দল হিসেবে আলজেরিয়া। শেষ ৩২-এ অস্ট্রিয়ার প্রতিপক্ষ স্পেন, আর আলজেরিয়া মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ডের। বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হচ্ছে ২৮ জুন থেকে।