ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযানের গল্পে আরেকটি হতাশার অধ্যায় যোগ হলো। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বহুল প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের (হেক্সা) স্বপ্ন ২০২৬ বিশ্বকাপেও পূরণ হলো না। শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২–১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে কার্লো আনচেলোত্তির দল। বিপরীতে, আর্লিং হালান্ডের অনবদ্য পারফরম্যান্সে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণের সংখ্যায় এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। তবে আধিপত্যকে ফলাফলে রূপ দিতে পারেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বরং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সুযোগ নষ্টের খেসারত দিতে হয়েছে তাদের।
প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন ব্রুনো গিমারায়েস। ম্যাচের গতি বিবেচনায় সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় মোড় ঘোরানো মুহূর্তগুলোর একটি। বড় ম্যাচে এমন সুযোগ হাতছাড়া করলে তার মূল্য যে কতটা চড়া হতে পারে, সেটিই আবারও প্রমাণিত হলো।
বিরতির পর খেলার ছন্দ বদলে যায়। ব্রাজিলের আক্রমণ যত এগিয়েছে, নরওয়ে তত সংগঠিতভাবে নিজেদের রক্ষণ সামলে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে মনোযোগ দেয়। সেই কৌশলই সফল হয়। ৭৯তম মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের ক্রস থেকে হেডে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন আর্লিং হালান্ড। ম্যাচের শেষ দিকে দূরপাল্লার শক্তিশালী শটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তনের সব সম্ভাবনা শেষ করে দেন তিনি।
যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ দিলেও তা শুধুই ব্যবধান কমিয়েছে। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপে আরেকটি অপ্রত্যাশিত বিদায়ের সাক্ষী হয় ব্রাজিল।
কৌশলগত লড়াইয়ে এগিয়ে নরওয়ে
পরিসংখ্যান বলবে, বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে শুধুমাত্র বলের নিয়ন্ত্রণ ম্যাচ জেতানোর নিশ্চয়তা দেয় না। নরওয়ে সেটিরই বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছে।
কোচ স্তালে সোলবাক্কেনের দল পুরো ম্যাচে নিজেদের রক্ষণকে সুসংগঠিত রেখেছে। মাঝমাঠে জায়গা সংকুচিত করে ব্রাজিলের সৃজনশীল খেলোয়াড়দের কার্যকর হতে দেয়নি। সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে উঠে এসেছে এবং সীমিত সুযোগকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছে।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের আক্রমণে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য থাকলেও দলগত সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে ফাইনাল থার্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ফিনিশিংয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব চোখে পড়েছে।
ব্রাজিলের পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি
২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ব্রাজিলের। ২০১৮ সালে বেলজিয়াম, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়া এবং এবার নরওয়ের বিপক্ষে বিদায়—প্রতিবারই নকআউট পর্বে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই, কিন্তু কঠিন ম্যাচে সুযোগ কাজে লাগানো, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষের কৌশলের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
ম্যাচ শেষে কোচ কার্লো আনচেলোত্তিও স্বীকার করেন, দল সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলোকে গোলে রূপ দিতে পারেনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য আরও সৃজনশীল মিডফিল্ডার তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
হালান্ডের নেতৃত্বে নতুন শক্তির উত্থান
ক্লাব ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ বহু আগেই দিয়েছেন আর্লিং হালান্ড। এবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও তিনি দেখালেন বড় ম্যাচের খেলোয়াড় কাকে বলে। তাঁর জোড়া গোল শুধু নরওয়েকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেনি, বরং দলটিকে শিরোপার সম্ভাব্য দাবিদারদের তালিকায়ও নিয়ে এসেছে।
ইউরোপিয়ান ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক উন্নতি করা নরওয়ে এবার সেই অগ্রগতির প্রতিফলন বিশ্বকাপের মঞ্চেও দেখাতে শুরু করেছে।
ব্রাজিলের সামনে আত্মসমালোচনার সময়
এই বিদায়ের পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সামনে নতুন করে প্রশ্ন উঠবে—শুধু তারকানির্ভর দল গঠন কি যথেষ্ট, নাকি প্রয়োজন আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত ফুটবল?
বিশ্বকাপে বারবার একই ধরনের ব্যর্থতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিবর্তন প্রয়োজন শুধু খেলোয়াড়ে নয়; প্রয়োজন পরিকল্পনা, কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতিতেও।
বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায় যতটা একটি ম্যাচের ফল, তার চেয়েও বেশি একটি বার্তা—আধুনিক ফুটবলে নামের চেয়ে সংগঠিত দলগত পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই পরীক্ষায় এবার সফল হয়েছে নরওয়ে, ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল ব্রাজিল।